জাতীয়তাবাদ
ধর্ম নয়, ভাষা ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে গড়া পরিচয়; যেখানে বাংলার পাশাপাশি এ দেশের প্রতিটি জাতিসত্তার ভাষা ও সংস্কৃতি সমান মর্যাদা পায়।
দলনিরপেক্ষ · অলাভজনক · স্বেচ্ছাসেবী
জ্ঞান কোনো বিশেষ শ্রেণির সম্পত্তি নয়; তা প্রতিটি মানুষের জন্মগত অধিকার। যে সমাজে বই পৌঁছায় না, সেখানে প্রশ্নও পৌঁছায় না; আর যেখানে প্রশ্ন নেই, সেখানে মুক্তিও নেই।
ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত এ দেশের মানুষ প্রমাণ করেছে যে জ্ঞান, ভাষা আর প্রশ্ন করার অধিকারই মুক্তির ভিত। একাত্তরে যারা এই জাতিকে দমাতে চেয়েছিল, তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে আঘাত হেনেছিল, বেছে বেছে হত্যা করেছিল শিক্ষক, লেখক আর চিন্তাবিদদের। সেই যুদ্ধ আমাদের স্বাধীনতা দিয়েছে।
স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল "সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার"-এর; আর ১৯৭২ সালের সংবিধান ঘোষণা করেছিল, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার যে আদর্শ এ দেশের মানুষকে মুক্তিসংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করেছিল, তা-ই হবে রাষ্ট্রের মূলনীতি। সেই প্রতিশ্রুতি আজও পূর্ণ হয়নি।
যতদিন এ দেশের একটি শিশুও বুঝে পড়তে না শেখে, ততদিন মুক্তির লড়াই শেষ হয়নি।
পাঠ দিয়ে শুরু; পাঠ জাগায় প্রশ্ন; প্রশ্ন করার অধিকার সবার সমান; আর সবার সেই সাহসেই মানুষ ও সমাজের মুক্তি। প্রতিটি শব্দে চাপ দিলে দেখা যাবে, সেটি কোন মূলনীতির নির্যাস।
পাঠ — জ্ঞানচর্চা, আজীবন শিক্ষা, আর নিজের জনপদের ইতিহাস, ভাষা ও ঐতিহ্য পড়া ও সংরক্ষণ করা।
প্রশ্ন — মুক্তচিন্তা, বিজ্ঞানমনস্কতা, আর পাঠকের পড়ার স্বাধীনতা।
সাম্য — জ্ঞানে সবার সমান অধিকার, আর ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি, লিঙ্গ ও সক্ষমতা নির্বিশেষে মানুষের সমান মর্যাদা।
মুক্তি — মুক্তিযুদ্ধ আমাদের দিয়েছে স্বাধীনতা; কিন্তু মুক্তি এখনো অসমাপ্ত। অজ্ঞতা, কুসংস্কার, বৈষম্য আর ভয় থেকে প্রতিটি মানুষের বুদ্ধি ও বিবেকের মুক্তি — সেই অসমাপ্ত কাজ এগিয়ে নেওয়াই এই আন্দোলনের লক্ষ্য।
সংশ্লিষ্ট মূলনীতি:
এখানে "সাম্য" ও "মুক্তি" কোনো দলীয় মতবাদের নাম নয়; এদের অর্থ আন্দোলনের ঘোষণাপত্রই নির্ধারণ করে।
স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের তিন প্রতিশ্রুতি — সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার — আমাদের গন্তব্য। ১৯৭২ সালের সংবিধানের চার মূলনীতি সেই গন্তব্যের পথে জাতির প্রথম পথনকশা। আন্দোলন এগুলো ধারণ করে নিজের কাজের পরিসরে, এই অর্থে:
ধর্ম নয়, ভাষা ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে গড়া পরিচয়; যেখানে বাংলার পাশাপাশি এ দেশের প্রতিটি জাতিসত্তার ভাষা ও সংস্কৃতি সমান মর্যাদা পায়।
মানুষের ওপর মানুষের শোষণ ও বৈষম্যমুক্ত সমাজের আকাঙ্ক্ষা; জ্ঞান গণসম্পদ, কেনাবেচার পণ্য নয়।
মত প্রকাশ, অংশগ্রহণ ও জবাবদিহির অধিকার; প্রতিটি পাঠাগার নিজেই হবে গণতান্ত্রিক চর্চার ক্ষেত্র।
সব ধর্মের সমান মর্যাদা, কোনো ধর্মের মানুষের প্রতি বৈষম্য নয়, এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহারের বিরোধিতা। ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়।
এই আদর্শের প্রতি অঙ্গীকার কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্য নয়। যে দল, গোষ্ঠী বা কর্তৃপক্ষই এই আদর্শ থেকে সরে যাক, আমাদের অবস্থান একই থাকবে।
মূলমন্ত্রের পূর্ণ ব্যাখ্যা। প্রতিটি মূলনীতিতে চাপ দিলে তার ব্যাখ্যা খুলবে।
আমরা ঘোষণা করছি — শিক্ষা কোনো বয়সে শেষ হয় না, কোনো সনদে সীমাবদ্ধ থাকে না। পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা এবং জীবনব্যাপী জ্ঞান অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি করাই আমাদের প্রথম ব্রত।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা যেখানে থেমে যায়, পাঠাগার সেখান থেকে শুরু হয় — শ্রেণিকক্ষের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়, পরিপূরক হিসেবে। আমরা চাই, প্রতিটি পাঠাগার হয়ে উঠুক এমন এক বিদ্যালয় — যার কোনো ভর্তি পরীক্ষা নেই, কোনো বেতন নেই, কোনো শেষ ক্লাস নেই।
আমরা ঘোষণা করছি — জ্ঞান যদি মানুষকে মানবিক না করে, তবে তা অসম্পূর্ণ। সততা, সহমর্মিতা, অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবকল্যাণের মূল্যবোধ আমরা কেবল কথায় নয়, কাজে প্রতিষ্ঠা করব।
কোনো নির্দিষ্ট মত চাপিয়ে দেওয়া পাঠাগারের কাজ নয়; তার কাজ মানুষকে নিজের বিবেক দিয়ে বিচার করার ক্ষমতা দেওয়া। যে পাঠাগারে সব ধর্মের, সব মতের মানুষ পাশাপাশি বসে পড়ে, সেই পাঠাগার নিজেই অসাম্প্রদায়িকতার জীবন্ত পাঠ।
আমরা ঘোষণা করছি — আমরা কেবল উত্তর মুখস্থ করা পাঠক চাই না; আমরা চাই প্রশ্ন করতে জানা মানুষ। যুক্তিবাদী চিন্তা, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডকে আমরা উৎসাহিত করব।
কোনো প্রশ্নই এখানে নিষিদ্ধ নয়; কোনো কৌতূহলই এখানে অপরাধ নয়। যুক্তি ও প্রমাণের কষ্টিপাথরে সবকিছু যাচাই করার সাহসই এই আন্দোলনের প্রাণ।
আমরা ঘোষণা করছি — জ্ঞানের দরজায় কোনো দারোয়ান থাকবে না। গ্রাম-শহর, ধনী-দরিদ্র, লিঙ্গপরিচয় ও শারীরিক সক্ষমতা নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের কাছে পাঠাগার ও তথ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া আমাদের অঙ্গীকার।
গ্রামে গ্রামে পাঠাগার, ভ্রাম্যমাণ পাঠাগার, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দুয়ারে বই। সমান সুযোগ মানে সবার প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা।
আমরা ঘোষণা করছি — কী পড়া যাবে আর কী পড়া যাবে না, তা ঠিক করার অধিকার পাঠকের নিজের। আমরা পাঠকের পড়ার স্বাধীনতা রক্ষা করব এবং জ্ঞানের ওপর যেকোনো অবরোধের বিরুদ্ধে দাঁড়াব।
পাঠকের স্বাধীনতার আরেক নাম পাঠকের গোপনীয়তা: কে কী পড়ছে, কী খুঁজছে — তার নথি পাঠাগার রাখবে সর্বনিম্ন, কারণ যে নথি রাখাই হয় না, তা কেউ কেড়ে নিতে পারে না।
আমরা ঘোষণা করছি — পাঠাগার কেবল জ্ঞান বিতরণের কেন্দ্র নয়; জ্ঞান সৃষ্টি ও সংরক্ষণেরও কেন্দ্র। প্রতিটি জনপদের নিজস্ব ইতিহাস, ভাষা, লোকসাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আমরা সংগ্রহ করব, সংরক্ষণ করব, নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেব।
প্রতিটি জনপদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস — মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের স্মৃতি — সংগ্রহ ও সংরক্ষণ এই মূলনীতির বিশেষ অগ্রাধিকার, কারণ সেই প্রজন্ম দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে।
স্বাধীনতার ঘোষণাগুলো যেন কখনো তার উল্টো অর্থে ব্যবহৃত না হয়, সে জন্য চারটি সীমারেখা।
এক
মতের বহুত্ব সুরক্ষিত; কিন্তু কোনো ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠীর মর্যাদা অস্বীকারকারী বিদ্বেষ ও বৈষম্য কখনো "একটি মত" হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাবে না।
দুই
প্রশ্নের অধিকার অবাধ; কিন্তু প্রশ্নের নামে হয়রানি বা হেনস্তা প্রশ্ন নয় — জানার আকাঙ্ক্ষা আর আঘাতের অভিপ্রায় এক জিনিস নয়।
তিন
কোন বই সংগ্রহে ঢুকবে তা নির্ধারণ করবে প্রকাশ্য সংগ্রহনীতি; কিন্তু একবার সংগ্রহে ঢোকা কোনো বই মতাদর্শিক চাপে সরানো হবে না।
চার
বয়স-উপযোগী পাঠপরিবেশ জ্ঞানের দরজায় দারোয়ানি নয় — শিশুকে নিরাপদে সেই দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা।
ই-বই, ইন্টারনেট সুবিধা আর গুজব, অপতথ্য ও ভুয়া খবর চেনার নিয়মিত কর্মশালা।
ঘর ও কর্মস্থলের বাইরে "তৃতীয় ঠিকানা" — আলোচনা, বিতর্ক, বিজ্ঞানমেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
নির্বাচিত ও জবাবদিহিমূলক কমিটি, উন্মুক্ত আয়-ব্যয়ের হিসাব, তরুণ ও নারীদের নেতৃত্ব।
বহুমুখী, স্বচ্ছ ও শর্তমুক্ত অর্থায়ন; কোনো একক উৎসের ওপর নির্ভরতা নয়। অর্থায়নের স্বাধীনতাই পাঠকের স্বাধীনতার প্রথম রক্ষাকবচ।
স্পষ্ট আচরণবিধি, বয়স-উপযোগী পাঠপরিবেশ, অভিযোগে দ্রুত ও দায়িত্বশীল ব্যবস্থা, কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকের প্রশিক্ষণ।
নিরিবিলি পড়ার ঘর, পাঠ-সহায়তা ও বিনা পয়সার সহপাঠী পাঠচক্র। পাঠাগারে কেউ কারও প্রতিদ্বন্দ্বী নয় — কোনো মেধাতালিকা বা র্যাঙ্কিং নেই।
পাঠক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, লেখক, অভিভাবক, সাংস্কৃতিক কর্মী — জ্ঞানের আলো ছড়াতে চান এমন যে-কেউ এই আন্দোলনের অংশীদার। আনুষ্ঠানিক সদস্যপদ নেওয়া হয় নিজের এলাকার শাখায়; যেখানে শাখা নেই, সেখানে সরাসরি কেন্দ্রে।
চাঁদা ও আজীবন সদস্য ফি প্রতিষ্ঠা সভায় নির্ধারিত হবে। যিনি চাঁদা দিতে অক্ষম, কমিটি গোপনে তাঁর চাঁদা মওকুফ করতে পারে — পূর্ণ ভোটাধিকারসহ।
আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাকালীন দলিল — সবই খসড়া, প্রতিষ্ঠা সভায় অনুমোদনের অপেক্ষায়।